Text size A A A
Color C C C C
সর্ব-শেষ হাল-নাগাদ: ৬ August ২০১৯

ইতিহাস

প্রকৃতির অনাবিল সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ। এদেশের দিগন্তজোড়া সমভূমির একপাশে রয়েছে বঙ্গোপসাগরের সুগভীর জলরাশি; আর সুনীল সাগরের অবিরাম ঢেউয়ের ওপর বয়ে যাওয়া হিমেল হাওয়া নিরন্তর আঁছড়ে পড়ছে যার উদ্ধত শিখরে তা বাংলাদেশের আকাশছোঁয়া সীমানা এদেশের সর্বোচ্চ শিখর তাজিনডং ও ক্যাওক্রাডং’এর দুর্গম গিরিশোভামণ্ডিত মনোহর এক আরণ্য জনপদ --- বান্দরবান। প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য, জীব বৈচিত্র্য, জাতি বৈচিত্র্য আর সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য --- বান্দরবানের পরতে পরতে বৈচিত্র্যের ছাপ। এত বৈচিত্র্যের মাঝেও এক সুর এক ছন্দ --- যেন বৈচিত্র্যের মহামিলন (Unity in diversity)। একমাত্র বান্দরবান পার্বত্য জেলাতেই রয়েছে বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের ১১টি তথা সকল ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাস; যথা : মারমা, ম্রো, ত্রিপুরা, বম, তঞ্চঙ্গ্যা, চাকমা, চাক, খেয়াং, খুমী, লুসাই ও পাংখোয়া। এত অধিক সংখ্যক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর একত্রে বসবাস বাংলাদেশে অন্য কোন জেলাতে নেই। তাই স্মরণাতীত কাল থেকেই হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান-পাহাড়ি-বাঙালি বহু ভাষাভাষী বহু জাতি-গোষ্ঠীর বহুরঙা সংস্কৃতির ঐতিহ্যসমৃদ্ধ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সৌহার্দময় পরিবেশে সহাবস্থান এ জেলাকে করে তুলেছে বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের সবচেয়ে মনোরম ও শান্তিপূর্ণ জনপদ। আর বান্দরবান হয়ে রয়েছে বর্ণালি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রাণকেন্দ্র। অথচ দুর্গম সব পাহাড়-পর্বত আর শ্বাপদসঙ্কুল প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে এখানকার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবনধারা, বিশেষত তাদের লোকসংস্কৃতি এখনও রয়ে গেছে জাতীয় সংস্কৃতির মূল স্রোতোধারা থেকে অনেক দূরে।

          এবংবিধ পটভূমিকায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন ক্রীড়া ও সংস্কৃতি বিভাগের স্মারক নং - এফ.২ /৪৯/৭৬-(সি)/৫০০/৭ তারিখ : ২২.০৬.১৯৭৬ মোতাবেক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনগণের জীবনধারা ও তাদের রীতিনীতি ও প্রথার উপর গবেষণা কাজ পরিচালনা করা এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনগণ ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের জনগণের মধ্যে বিদ্যমান সাধারণ বৈশিষ্ট্যসমূহ তুলে ধরার লক্ষ্য নিয়ে ১৯৭৮ সালে রাঙ্গামাটিতে উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হয়, যাতে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে দেশের জাতীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনের মূল স্রোতোধারায় সম্পৃক্ত করা সম্ভবপর হয়। ১৯৮১ সালের জুলাই মাসে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের (তৎকালীন ক্রীড়া ও সংস্কৃতি বিভাগের) প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে অর্পণ অবধি এ ইনস্টিটিউটকে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে একটি প্রকল্প আকারে পরিচালনা করা হয়। অতঃপর মহামান্য রাষ্ট্রপতির ৩০.০৩.১৯৮৫ তারিখের সদয় অনুমোদন অনুসারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংস্কৃতি বিষয়ক বিভাগের স্মারক নং - শাঃসঃ ২/২-১৭/৮১/৫৬৫ তারিখ : ৩১.০৩.৮৫ ইং মোতাবেক ১৩.০৬.১৯৮৫ তারিখে বান্দরবানে একটি এবং কক্সবাজারে অপর একটি আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপন করা হয়।

          ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতির উন্নয়ন, বিকাশ, সংরক্ষণ, লালন এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনগণকে জাতীয় সংস্কৃতির সাথে পরিচিত করে তোলার লক্ষ্যে এ জেলায় আরও অধিকতর ফলপ্রসু ও সুষ্ঠুভাবে কার্য পরিচালনার উদ্দেশ্যে মহামান্য রাষ্ট্রপতির ০৫.০৪.১৯৮৮ তারিখের সদয় অনুমোদন অনুসারে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের স্মারক নং - শাঃ ৭/উসাই/৬-৭/৮৭ তারিখ : ০৪.০৮.১৯৮৮ ইং/ ২০.০৪.১৩৯৫ বাং মোতাবেক  ০১ জুলাই ১৯৮৮ তারিখ হতে বান্দরবান পার্বত্য জেলা শহরে এ মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন সংস্থা হিসেবে একটি স্বতন্ত্র উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট স্থাপন করা হয় এবং রাঙ্গামাটিস্থ উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের বান্দরবানে অবস্থিত আঞ্চলিক কার্যালয়কে বান্দরবান উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের প্রধান কার্যালয়ে রূপান্তরিত করা হয়। অতঃপর বান্দরবান পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন, ১৯৮৯ (১৯৮৯ সনের ২১ নং আইন)’এর ২৩(খ) ধারার অধীনে সরকার কর্তৃক বিগত ২১.১১.১৯৯৩ তারিখে সম্পাদিত এবং ০১ মে ১৯৯৩ ইং/ ১৮ বৈশাখ ১৪০০ বাং তারিখ হতে কার্যকর হওয়া চুক্তিনামা অনুসারে বান্দরবান উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটকে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের (তদানীন্তন বান্দরবান পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ) নিকট হস্তান্তর করা হয়।

 

          বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ কর্তৃক গত ৫ এপ্রিল ২০১০ তারিখে বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের লক্ষ্যে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা ও আনুষঙ্গিক বিষয়াদি সম্পর্কে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন, ২০১০ (২০১০ সনের ২৩ নং আইন) পাশ করা হয়েছে, যা বাংলাদেশ গেজেট, অতিরিক্ত সংখ্যা, সোমবার, এপ্রিল ১২, ২০১০ তারিখে সর্বসাধারণের অবগতির জন্য প্রকাশিত হয়েছে। এ আইন বলবৎ হবার সঙ্গে সঙ্গে এ প্রতিষ্ঠান ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, বান্দরবান নামে অভিহিত এবং স্বতন্ত্র আইনগত সত্ত্বাবিশিষ্ট একটি সংবিধিবদ্ধ সংস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ প্রেক্ষিতে পূর্বনাম উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, বান্দরবান’এর স্থলে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, বান্দরবান ব্যবহৃত হচ্ছে।

          প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বান্দরবান ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা বান্দরবান পার্বত্য জেলার ১১টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতি সংরক্ষণ, লালন, উন্নয়ন ও বিকাশ সাধন এবং তাদের আচারআচরণ, রীতিনীতি ও জীবনধারার উপর গবেষণা কাজ পরিচালনা করে তাদের সংস্কৃতি চর্চা ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের মাধ্যমে তাদেরকে জাতীয় জীবনের মূল স্রোতোধারায় সম্পৃক্ত করার উদ্দেশ্যে ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনগণকে জাতীয় সংস্কৃতির সাথে পরিচিত করে তোলার লক্ষ্যে এ জেলার প্রতিটি এলাকায় সকল ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য বিভিন্ন ধরনের ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। ফলশ্রুতিতে বান্দরবান পার্বত্য জেলার প্রতিটি উপজেলায়, বিশেষত দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকায় বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনগণকে জাতীয় সংস্কৃতির মূল স্রোতোধারার সাথে সম্পৃক্ত করা সম্ভবপর হয়েছে ও তাদের সাংস্কৃতিক জীবনধারার উপর গবেষণা পরিচালনাপূর্বক তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে অবদান রাখার অভূতপূর্ব সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

          এ ইনস্টিটিউটকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্য নিয়ে ১৯৯০-১৯৯৪ মেয়াদে বান্দরবানে উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট কমপ্লেক্স নির্মাণ শীর্ষক একটি প্রকল্পের মাধ্যমে ১.১৭ একর ভূমি অধিগ্রহণ ও উন্নয়ন করে ৪৬৫ বর্গমিটার আয়তনের একটি তিনতলা প্রশাসনিক ভবন ও ৪৫ বর্গমিটার আয়তনের একটি গ্যারেজ-কাম-ড্রাইভার শেড নির্মাণ করা হয়। অতঃপর অবকাঠামোগত ও অন্যান্য চাহিদা পরিপূরণের মাধ্যমে বান্দরবান পার্বত্য জেলা তথা বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনগণকে তাদের সংস্কৃতি চর্চার মান উন্নয়নের মাধ্যমে তাদের সাংস্কৃতিক জীবনধারার উপর গবেষণা পরিচালনাপূর্বক তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে বাস্তবভিত্তিক সুযোগসুবিধাদি সৃষ্টি করার জন্য এ ইনস্টিটিউটের অধীনে ১৯৯৯-২০০৬ মেয়াদে বান্দরবান উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট স্থাপন (২য় পর্যায়) শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় ১,১৫৬ বর্গমিটার আয়তনের একটি দোতলা জাদুঘর-কাম-গ্রন্থাগার ভবন, ৮৯২ বর্গমিটার আয়তনের একটি দোতলা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র-কাম-হোস্টেল ভবন, ৪০০ আসনবিশিষ্ট একতলা মিলনায়তনসহ ১৪৪৭ বর্গমিটার আয়তনের একটি দোতলা অডিটরিয়াম ভবন, ৯২৯.৩৫ বর্গমিটার আয়তনের কর্মকর্তাদের জন্য ৬ ইউনিটের একটি তিনতলা আবাসিক ভবন, ৬০০ বর্গমিটার আয়তনের কর্মচারীদের জন্য ৬ ইউনিটের একটি তিনতলা আবাসিক ভবন নির্মাণ এবং ইনস্টিটিউটের জন্য আনুষঙ্গিক অন্যান্য কাজ বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

          ইতিমধ্যে ইনস্টিটিউটের জন্য অবকাঠামোগত সুযোগসুবিধা ও অন্যান্য চাহিদা পরিপূরণের মাধ্যমে এ জেলার সকল স্তরের ব্যাপক জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে সমাজের দরিদ্রতম অংশের লোকদের উপর শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং কর্ম ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত প্রভাব বিস্তার করতে এ ইনস্টিটিউট সক্ষমতা লাভ করেছে। এর ফলস্বরূপ এ অঞ্চলে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতি চর্চার মান উন্নয়ন ও বিকাশ সাধন উত্তরোত্তর ত্বরান্বিত হয়েছে এবং পুরুষের পাশাপাশি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মহিলাদের সাংস্কৃতিক জীবনধারা অধিকতর উন্নত ও বিকশিত হয়েছে। সর্বোপরি বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা বান্দরবান পার্বত্য জেলায় বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সুপ্রাচীন ও বৈচিত্র্যময় আদি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক আকারে তুলে ধরতে এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকশিল্পীগণকে আবহমানকাল থেকে লালিত তাদের লোকসংস্কৃতির অমূল্য ভাণ্ডারকে সযত্নে লালন করে বিলুপ্তি ও বিকৃতির করাল গ্রাস হতে রক্ষা করতে আরও অনুপ্রাণিত করা সম্ভবপর হয়েছে। তাছাড়া এ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক বিকাশ সমৃদ্ধতর করার পাশাপাশি নন্দন সংস্কৃতি এবং শিল্পকলার যুগোপযোগী বিকাশ সাধনের মাধ্যমে মানবসম্পদ উন্নয়ন করে পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থানমূলক সুযোগসুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা যাবে।


Share with :

Facebook Facebook